দুই বাংলার সাবেক ও হালফিলের রান্না

ফুলে ফুলে মধু...ঋজু বসু | কলকাতা, ১ ডিসেম্বর ২০১২

‘দ্য মনসুন ওয়েডিং’ ছবির সেই দুবেজি-র কথা মনে আছে? বিয়েবাড়ির পেশাদার জোগাড়ে তাঁর হাজারো ব্যস্ততার ফাঁকে একটার পর একটা আস্ত গাঁদাফুল চিবিয়ে খাচ্ছেন।
আমরা মৎস্যপ্রেমী-মাংসপ্রেমী বাঙালি আজকাল দেশে-বিদেশে নানা আজব মাংস খেতে আপত্তি করি না। কাঁচা মাছের সুশি বা সাশিমি তৃপ্ত ভঙ্গিতে না-সাঁটালেও আমাদের জাত থাকে না। তবু দ্য সনেট রেস্তোরাঁর আপ্যায়নে গোটা একটা লিলিফুল পাতে এগিয়ে দিলে কিঞ্চিৎ অসহায় লাগছিল। ফলের রসের অভিঘাতে স্নিগ্ধ ব্রেজ্ড চিকেনের মিষ্টি-মিষ্টি স্যালাডে মিশে যাওয়া সেই লিলির পাপড়ির সঙ্গে কখন ভাব জমে গেল, তা নিজেরই খেয়াল হয়নি।
সনেটের নানা ফলের সমাহারে সাইট্রাস বেরি কুলারও বেশ। ফলের সরবত তো কতই হয়! কিন্তু তাতে প্যানসি ফুল মিশে থাকার সোয়াদ সচরাচর চাখার ভাগ্যি হয় কই! প্যানসি নামটার মধ্যেই সাহেবভক্ত বাঙালির রোম্যান্টিকতা উথলে ওঠে। জঙ্গলমহলে বা একদা কলকাত্তাইয়াদের সাধের পশ্চিম রাঁচি-সিংভূমে যে রংবেরঙের ঘেঁটু-পুটুসের সমারোহ দেখা যায়, আদতে প্যানসির চেহারা তার থেকে বিশেষ আলাদা বলে ঠাহর হয় না। সেই ফুলের নির্যাসই খাদ্যে-পানীয়ে মিশে পেটে ঢুকছে ভাবলে বেশ একটা উচ্ছ্বাস ভেতর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় বৈকী!
অমন লোভনীয় কুমড়োফুলকে এক বার কটাক্ষ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বলেছিলেন, কুমড়োফুল নিয়ে কবিতা লেখা যায় না, কারণ রান্নাঘর তার জাত মেরেছে। কিন্তু এ সব প্যানসি-লিলিকে নিয়ে কবিকুলে উচ্ছ্বাস কিন্তু মোটেও কম পড়েনি। তার উপরে সনেটে শেফ নীলাদ্রি চক্রবর্তী উবাচ, এ সব খাদ্যোপযোগী ফুল না কি স্বাস্থ্যকরও!
গেল হপ্তায় সেখানে অর্গানিক বা জৈব পদ্ধতিজাত ফলমূল-সব্জির মেনুর উৎসবে এমন কিছু কিছু ফুলের স্বাদও চেখে দেখা গেল।
আমাদের আজন্মের চেনা কুমড়োফুল, বকফুল বা সজনেফুলের উপকারিতার কথা অবশ্য জম্মেও মাথায় আসেনি। তবে ভেবে দেখলে মনে হয়, আর যা-ই হোক, রাশি-রাশি আলুভাজার থেকে এ সব ফ্রায়েড রান্না মোটেই বেশি ক্ষতিকর নয়। এই কুমড়োফুল নিয়েও হালে কলকাতার শেফকুলে উৎসাহের অন্ত নেই। শেফ চিরঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় ও শেফ জয়মাল্য বন্দ্যেপাধ্যায় দু’জনেই কুমড়োফুল নিয়ে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন। সান্ধ্য আহ্নিকে বাঙালি আলু, পেঁয়াজ, কড়াইশুঁটি অবধি স্মরণ করলেও কেন যে কলকাতার পানশালাগুলো কুমড়োফুলকে পাত্তা দেয় না, ভগবান জানে! এ সব হাল্কা মুচমুচে ভাজার পাতে দু’পাত্তর খাওয়াটা কখনওই বেমানান মনে হয় না।
আফরা-য় চিরঞ্জীব একদা কুমড়োফুলের মধ্যে চিজ ভরে দারুণ একটা রান্না বানিয়েছিলেন। বেসনের বদলে জাপানি টেম্পুরা ব্যাটারও কুমড়োফুলে দিব্যি জুত হয়। কুমড়োফুলের গর্ভে কাঁকড়ামাংস টাকনায় একটু কাসুন্দি মেখে খেলে দিব্যি লাগে। বোহেমিয়ান রেস্তোরাঁয় জয়মাল্য কিছু দিন আগে ইলিশের পুর ঠেসে কুমড়োফুল পেশ করেছিলেন। সেটাও দারুণ উপাদেয় ছিল।
কিন্তু রাঁধুনে বাঙালির কুসুমচর্চা এ কালে মোটেও কুমড়ো, বক বা সজনে ফুলে থেমে নেই। চিরঞ্জীবের দৌলতে জবা ফুলকে নিয়েও আশ্চর্য কাণ্ড দেখেছি। জবা ফুলের লস্যি! অত আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। রোজ ফ্লেভারের লস্যি তো কবে থেকেই খাচ্ছেন। তা জবাফুল কী দোষ করল। জবার সৌজন্যে টকটকে লাল রংটাও খোলতাই হয়। আর হাল্কা জিরেগুঁড়ো ও আদার ছোঁয়ায় এই নোনতা লস্যির স্বাদও চমৎকার।
আরও কিছুমিছু ফুল-পাতা-ডাঁটা এখন বাঙালির স্বাদভুবনে ঢুকে পড়েছে। কন্টিনেন্টাল রান্নার অনুষঙ্গে আগে গুটিকয়েক সস বা ক’টা নিষ্প্রাণ গাজর, আলু, কড়াইশুঁটি, বিন্সের বেশি কিছুর দেখা মিলত না। সেখানে এখন অনেক কিছু রয়েছে। ব্রকোলি, জুকিনির ফুলও বহু রেস্তোরাঁয় কন্টি খানা বা স্যালাডের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আরও এক জনের কথা বলতে হয়। টক-টক ফুলকুঁড়ি কেপার। নিউ মার্কেট থেকে শুরু করে যে কোনও সুপারমার্কেটেও এ জিনিস বোতল-বন্দি পাবেন। অনেকটা আচারের মতো টক-টক স্বাদ। মাছ বা চিকেনের স্টেকে দারুণ জমলেও আমার মনে হয় পরোটার সঙ্গে আচারের বদলে তৈলাক্ত কেপার দিলে ব্যাপারটা বেশ উপভোগ্য হবে।
তবু এখনও এ তল্লাটে লোভী খাইয়ের কাছে সব থেকে পরিচিত ফুল সেই গোলাপ। বাঙালি ময়রা ঢের আগে গোলাপজলের মহিমা আবিষ্কার করেছে। চন্দনী ক্ষীর বা রাবড়িতে গোলাপজলের ছিটে ম্যাজিক করতে পারে। একদা গুলাবজামুনের পেটে নাকি গোলাপপাপড়ির গুঁড়ো মেশানো হতো। আজকাল শর্টকাটের জমানা। বেশির ভাগই রং দিয়ে দায় সারেন। গোলাপজল দিয়ে সন্দেশও ঢের হয়। তবে ধ্রুপদী সন্দেশ গোলাপি পেঁড়ার গায়ে গোলাপপাপড়ি নেহাতই গার্নিশিং।
বিয়েবাড়িতেও এক সময়ে কেওড়া-সুবাসিত জল দেওয়া দস্তুর ছিল। এখন দেখাই যায় না। কেওড়ার ঘ্রাণের আবেশ থাকত পারিজাত সন্দেশেও। তবে এ কালে কেওড়ার বদলে পারিজাতে গোলাপজলই ব্যবহার করেন বেশিরভাগ ময়রা। সনেটে শেফ নীলাদ্রি দারচিনি ও গোলাপজল দিয়ে একটা চমৎকার ফলের স্যালাড করেন। এই দু’টি সুগন্ধের মিশেলে বেশ জমে ব্যাপারটা।
পথের পাঁচালির অপু-দুগ্গা দু’ভাইবোনে সারা দিন বনে-জঙ্গলে টো টো কোম্পানি করে রাজ্যের বুনো ফুল, ফল চেখে বেড়াত। বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন, দোকানের মিষ্টি কিনে খাওয়ার পয়সা যাদের নেই, বনদেবীরা সেই গরিব ছেলেমেয়েদের জন্যই ফুলের মধ্যে মিষ্টি মধু ভরে রেখেছেন। ফুলে ফুলে স্বাস্থ্যকর মধু চাখতে এ কালে রীতিমতো ট্যাঁকের কড়ি খরচা করেই দিকে দিকে রেস্তোরাঁ-অভিযান।
ক্ষীর বা রাবড়িতে গোলাপজলের ছিটে ম্যাজিক করতে পারে। একদা গুলাবজামুনের পেটে নাকি গোলাপপাপড়ির গুঁড়ো মেশানো হতো। আজকাল শর্টকাটের জমানা। বেশির ভাগই রং দিয়ে দায় সারেন। গোলাপজল দিয়ে সন্দেশও ঢের হয়। তবে ধ্রুপদী সন্দেশ গোলাপি পেঁড়ার গায়ে লাপপাপড়ি নেহাতই গার্নিশিং।
বিয়েবাড়িতেও এক সময়ে কেওড়া-সুবাসিত জল দেওয়া দস্তুর ছিল। এখন দেখাই যায় না। কেওড়ার ঘ্রাণের আবেশ থাকত পারিজাত সন্দেশেও। তবে এ কালে কেওড়ার বদলে পারিজাতে গোলাপজলই ব্যবহার করেন বেশিরভাগ ময়রা। সনেটে শেফ নীলাদ্রি দারচিনি ও গোলাপজল দিয়ে একটা চমৎকার ফলের স্যালাড করেন। এই দু’টি সুগন্ধের মিশেলে বেশ জমে ব্যাপারটা।
পথের পাঁচালির অপু-দুগ্গা দু’ভাইবোনে সারা দিন বনে-জঙ্গলে টো টো কোম্পানি করে রাজ্যের বুনো ফুল, ফল চেখে বেড়াত। বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন, দোকানের মিষ্টি কিনে খাওয়ার পয়সা যাদের নেই, বনদেবীরা সেই গরিব ছেলেমেয়েদের জন্যই ফুলের মধ্যে মিষ্টি মধু ভরে রেখেছেন। ফুলে ফুলে স্বাস্থ্যকর মধু চাখতে এ কালে রীতিমতো ট্যাঁকের কড়ি খরচা করেই দিকে দিকে রেস্তোরাঁ-অভিযান।

ছবি: শুভেন্দু চাকী
আনন্দবাজার পত্রিকা

খেয়ে দেখতে পারেন