বাংলা এল সবার ঘরে
my.anandabazar.com আমার হোম পেজ
বাংলা না এলে

দুই বাংলার সাবেক ও হালফিলের রান্না

‘ম’কারের মহিমাঋজু বসু | কলকাতা, ১৫ ডিসেম্বর ২০১২

এক ধরনের ভাল ‘ম’ আর খারাপ ‘ম’-এর তত্ত্ব। কৈলাস বসু স্ট্রিটের জগন্মাতা হোটেলের উৎকলজাত কর্ণধার তার মর্ম বিলক্ষণ বোঝেন। মাংস বলতে তিনি শুধু মাংসই চেনেন। খাবার ঘরে নারায়ণ আছেন, তাই আজও মুরগিকে হেঁশেলের ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেবেন না।
শ্যামবাজারের ভূমিপুত্র প্রদীপ পাল বা তাঁর শালাবাবু অরুণাভ দাসশর্মা এতটা একনিষ্ঠ হতে পারেননি ঠিকই। মেনুতে মাটনের পাশে মুরগিকেও রেখেছেন তাঁরা। কিন্তু কষা মাংসের প্রতি গভীর প্রেম এই শীতেও তাঁদের নিত্যনতুন উদ্ভাবনের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
আলুনি, ভেজের অধম ব্রয়লার নিয়ে আদিখ্যেতার যুগে প্রকৃত মাংস তথা ছাগ-অবতারেরর ভক্ত কাউকে দেখলে আমাদের কারও কারও বুকটা সত্যিই ভরে যায়। শ্যামবাজারে দেড়খানা ঘরে প্রাণান্তকর গরমে অসহ্য শারীরিক কষ্ট সহ্য করেও বাঙালি ১২ মাস ৩৬৫ দিন গোলবাড়ির কষার আস্বাদে বুঁদ হয়ে থাকে। কোলেস্টেরল-ইউরিক অ্যাসিড-ট্রাইগ্লিসারাইডাদি শত্রুর নাম করে যাবতীয় চোখরাঙানিতেও রোববারের খাসির টানে দোকানের লাইন এক ফোঁটা খাটো হয় না। কিন্তু ফি-বছর ঠান্ডা পড়লে কলকাতার মাটন-আবেগের যেন শতফুল বিকশিত হয়।
অন্ধ্রের ভেঞ্চানা মাংসম থেকে কেরলের আলিসা মাটন স্টুও এই কলকাতায় পাবেন। ট্যামারিন্ডে মশলাদার স্টুয়ের আমেজে এক মুহূর্তে সর্দি-গলাব্যথা পালাই-পালাই করবে। আবার মার্কোপোলোয় লেবানিজ ল্যাম্ব চপ থেকে মিত্র কাফের মাটন মোগলাই। পরেরটা বোনলেস গা-মাখা, প্রথমটা হাড়সুদ্ধ কাই-কাই। সরু লম্বা হাড়ের গায়ে নরম তুলতুলে ছাগ-মাংসে কামড় দিয়ে গার্লিক ব্রেডের টুকরোয় কাইটা সাপ্টে মেখে মুখে পুরলে জীবনের সব দুঃখ মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়। আর মিত্র কাফের ঝোলমাখা মাংসভাজা বিশেষের জুড়িও সহজে মিলবে না। এই মাটন মোগলাই সেঁকা পাঁউরুটি দিয়ে খেতে অমৃত! শুকনো লঙ্কা ও গোটা গোটা গোলমরিচে আলিয়া হোটেলের মাটন স্টু বা সাবিরের রেজালার মতো ক্লাসিক সৃষ্টিও বলা বাহুল্য শীতেই ঢের বেশি জমপেশ হয়ে ওঠে। একটা সংশয়ের নিরসন ঘটানো যাক। তামাম উপমহাদেশেই রেস্তোরাঁর মেনুতে ল্যাম্ব/ মাটন বলতে আদতে খাসি-পাঁঠাই বোঝানো হয়। কিন্তু ‘গোট’ শব্দটা ব্রাত্য।
কলকাতার এই মাটন-মানচিত্রে সম্প্রতি জায়গা করে নিয়েছে অরুণাভ-প্রদীপের কষেকষাও। মাটন-রসিকদের এক ঘোর দুর্দিনে, শ্যামবাজারের গোলবাড়ি বন্ধ থাকার সময়ে তাঁদের উত্থান। হাতিবাগানে কলকাতার পুরনো কষা ঘরানার পতাকা উঁচু রাখার কাজটাই তারা করে চলেছে। গোলপার্কে এই কষে কষারই অন্য অবতার। গোলবাড়ি-ঘরানার সেই কালচে থকথকে কাইয়ের জঙ্গি কষামাংস এখানে কিঞ্চিৎ স্তিমিত। তবে সঙ্গী চাট হিসেবে সেই গোলবাড়ি-স্পেশাল তেঁতুলের টকটা মজুত। সেই সঙ্গে শীতের এক গুচ্ছ ছাগমাংস-অর্ঘ তারা এ বার সাজিয়েছে।
মালাই কারির আদলে মালাই মাংস, পঞ্জাবি সাগ মাটনের প্রেরণায় পালং মাংস, গন্ধরাজ চিকেন-প্রভাবিত গন্ধরাজ মাংসের নানা নিরীক্ষা ইতিমধ্যে পেশ করেছে তারা। লাল ও সাদা দু’ধরনের কিমা, বাঙালি মুসলমানের হাতের টেক্কা ডালগোস্ত-ঘরানার ছোলার ডাল মাংস নিয়ে চর্চাও তুমুল। কিন্তু কষেকষার রাঁধুনি মাংস সত্যিই আবিষ্কার। রাঁধুনি ফোড়নের সুগন্ধ ও মাংসের দেবভোগ্য স্বাদের মিশেল এই পদে তর্কাতীত ভাবে শিল্পোত্তীর্ণ। ঈষৎ মোটা ঝোলটায় মশলার উপস্থিতি খানিক দানা-দানা। এই মাংসকে মর্যাদা দিতে স্রেফ একটু সাদা ভাত বা হাতে-গড়া নিরাভরণ রুটির সঙ্গতই যোগ্যতম। কষেকষা এক ধরনের তেলবিহীন বেক্ড পরোটা আমদানি করেছে। কিন্তু রাঁধুনি মাংসের সঙ্গী হিসেবে তাকেও কিছুটা উচ্চকিত মনে হয়। এ মাংসের স্বাদ গভীর ভাবে উপভোগ করতে ভাজাভুজি লুচি-পরোটার নাকগলানি কখনো চলবে না।
বাঙালি রান্নার নয়া ঘরানার শেফ জয়মাল্য বন্দ্যোপাধ্যায় একদা কষা মাংসের জব্বর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাঁচা লঙ্কা মাংসকে দাঁড় করিয়েছিলেন। লঙ্কার সুঘ্রাণদীপ্ত কিন্তু আহা-উহু ঝালবিহীন এই মাংস সাম্প্রতিক কালের বাঙালি রান্নার একটি সমীহযোগ্য সৃষ্টি। জয় তাঁর বোহেমিয়ান রেস্তোরাঁতেও দেশি-বিদেশি নানা উপাদান মিশিয়ে মাটন-চর্চায় মশগুল। কাঁচা আম-চিজ, ধনেপাতা-কালো জিরে, দই-কাঁচা লঙ্কা বা আদা-মৌরির মতো অপ্রত্যাশিত নানা কম্বিনেশনে ছাগমাংসের উৎকর্ষ তিনি প্রচার করে চলেছেন।
কষেকষাও মাটন-স্বাদে কিছুটা বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছে। তবে যুগ যুগ ধরে বাঙালির প্রাণের কচি পাঁঠার ঝোল বা কষা কেউই ওই তল্লাটে উপেক্ষিত নয়। আর গরম মশলা-সুবাসিত ঝোল-ঝোল চেনা ঘরোয়া মাংসের নাম এখানে ঢাকাই মাংস। ব্রয়লার চিকেন তপস্যা করলেও এই স্বাদ আয়ত্ত করতে পারবে না। তাই স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে যাবতীয় সংস্কার আপাতত মুলতুবি থাকুক। মিষ্টি শীতে এই ‘ম’য়ের দোষটুকুতে বাগড়া দেওয়া একেবারেই বেরসিকের কাজ।

মেনুর হিট: রাঁধুনি মাংস (এক প্লেট)
উপকরণ
• খাসির মাংস: ১৬৫ গ্রাম • সর্ষের তেল: ৫০ গ্রাম • পেঁয়াজকুচি: ১০০ গ্রাম • আদাকুচি: ২০ গ্রাম • রসুনবাটা: ১৫ গ্রাম • শুকনো লঙ্কাবাটা: ৩ গ্রাম • হলুদগুঁড়ো: ২ গ্রাম • কাজুবাদামবাটা: ৫ গ্রাম • রাঁধুনি: ১০ গ্রাম • ধনেগুঁড়ো: ১০ গ্রাম • তেঁতুলজল: ১ চা-চামচ • নুন-চিনি: স্বাদমতো

প্রণালী
• কড়ায় সর্ষের তেল গরম করে নিন।
• পেঁয়াজ, রসুন, আদাবাটা দিয়ে কষান।
• রাঁধুনি, ধনে, তেঁতুলবাটা, শুকনো লঙ্কা, হলুদ, কাজুবাদামবাটা দিয়ে ভাল ভাবে নেড়েচেড়ে নিন।
• এ বার মাংসটা দিয়ে নেড়েচেড়ে ঢাকনি চাপা দিয়ে ভাল ভাবে সেদ্ধ করুন।
• শেষে নুন-চিনি ছিটিয়ে মাংসটা আর একটু কষিয়ে নামান।

 

ছবি: শুভেন্দু চাকী
আনন্দবাজার পত্রিকা

খেয়ে দেখতে পারেন