বাংলা এল সবার ঘরে
my.anandabazar.com আমার হোম পেজ
বাংলা না এলে

দুই বাংলার সাবেক ও হালফিলের রান্না

সুস্বাদু প্রভাতঋজু বসু | কলকাতা, ১২ জানুয়ারি ২০১৩

আ-আলজিভ চুমু! শব্দটা বেড়ে ফেঁদেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এঁচোড়ে পাকা বয়সে এর মর্ম বোঝা ইস্তক আমরা রীতিমতো পুলকিত হয়েছি।
ক’দিন আগে শীতের সকালে শব্দটা ফের মনে পড়ল। মল্লিকবাজারে সিরাজ রেস্তোরাঁর খাস তালুকে যখন আমাদের টেবলে হাসিমুখে কানা-উঁচু ধূমায়িত বাটি নামিয়ে রাখলেন আপ্যায়নকারী। স্বাদু ঝোলের এই উষ্ণতা বিনা শীতকাল বৃথা। আর তুলতুলে নরম মাংস মুখে দিতে প্রায় গলে যায়! ঝোলের মধ্যে ভাসমান সেই মাংসখণ্ডটি খাসি বা পাঁঠার স্বাদেন্দ্রিয়। উর্দু-হিন্দিতে যাকে জুবান (zuবান) বলে, তার সঙ্গে কাল্লা বা চোয়ালের অংশও খানিকটা পরিবেশিত হয়েছে। বিভিন্ন কোল্ডমিটের মধ্যে অক্সটাং-এর বিশেষ খ্যাতি আছে। কিন্তু এই গোট-টাং কলকাতায় খুব সুলভ নয়। সিরাজের হেঁসেলে গোমাংস ঢোকে না। সকালের জলখাবারে মাটনের এই বৈচিত্র্য তারা মাথায় করে রেখেছে।
অনেক দূরের কোহিমা-ইম্ফল বা ইদানীং বেশ কাছের ব্যাঙ্কক-হংকংয়ের বাজারে যে সব বিচিত্র মাংস-টাংসের পসরা সাজানো থাকে, তার পাশে এই ‘জুবান’ নেহাতই জলভাত। কলকাতার প্রাতঃরাশ ঐতিহ্যে ফ্লুরিজের বিন্স অন টোস্ট-ফ্রায়েড এগ, বাগবাজারের গরম জিলিপি-কচুরি ইত্যাদির সঙ্গে এ বস্তুর সমান আদর।
মল্লিকবাজারের ওই তল্লাট কিংবা পার্কসার্কাস-বেনিয়াপুকুর থেকে শুরু করে মুজতবা আলি-বর্ণিত জাকারিয়া স্ট্রিট বা খিদিরপুর-টুরের সকাল মানেই মাংসের নানা কিসিমের স্বাদগন্ধে ভরপুর। হায়দরাবাদের একটি স্মরণীয় সকালের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সাত-সকালে স্টেশনের কাছের আলফা রেস্তোরাঁয় মাথার উপরে ছাতার মতো প্রকাণ্ড পরোটা টক-ঝাল কিমা কষায় ডুবিয়ে তৃপ্তি করে খেয়েছিলাম বটে! তার পরে দুধ-চায়ে ডুবিয়ে শুকনো ফলখচিত মন ভাল-করা কিছু লোকাল বিস্কুট। কলকাতা এমন ব্রেকফাস্ট-রসে বঞ্চিত ভাবাটা ঠিক নয়। বিশেষত শীতকালে ফজরে নমাজ শেষের ব্রাহ্ম মুহূর্তে জবরদস্ত পায়া-নেহারির বীররসে এ শহরের সকালও আলাদা মহিমা লাভ করে।
ঘটনা হল, মাছের শরীর নিয়ে বাঙালি যত ভেবেছে, কিংবা তরকারিতে ঝাল-ঝোল-ডালনা-ঘণ্ট থেকে ট্যালটেলে-কষা-কাইকাই-রসার রকমফের নিয়ে বাঙালির শব্দকোষ যত সমৃদ্ধ, মাংস নিয়ে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। মাছের পেটি, গাদা, মুড়োর মতো সুন্দর শব্দ মাংসের ক্ষেত্রে কই? মাংসের চাঁপ বা কন্টিনেন্টাল ল্যাম্ব চপের নামকরণ যে আসলে হাড়সুদ্ধ বড়সড় এক পিস মাংসের আকার-মাহাত্ম্যে তা আমাদের মাথায় থাকে না।
তেমনই মাছের মুড়ো বা চিংড়ির ঘিলু তারিয়ে তারিয়ে চুষে খাওয়াকে সুরসিকের কাজ বলে মনে করলেও প্রাণীর নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আস্বাদনে অনেকেরই কিছু দুর্লঙ্ঘ্য সংস্কার আছে। বিফ-মাটনের মগজ, জুবান থেকে শুরু করে ফেঁপড়া (ফুসফুস), গুরদা (কিডনি)-এ সবই কিছুটা নিম্নবিত্ত বিলাস বলেই এ শহরের অনেকেরই ধারণা। মধ্যবিত্ত জীবন তাই প্রধানত আলুনি ব্রয়লারের ঠ্যাং বা মাইক্রোআভেনে গরম করা চৌকো মতো বোনলেস মাংসের কাবাব খাওয়ার একঘেয়েমিতেই দিব্যি কেটে যাচ্ছে।
সিরাজে এসে একটু স্বাদবদল করতেই পারেন। খানদানি মোগলাই ব্রেকফাস্ট এমন পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসে চাখার জায়গা কলকাতায় খুব বেশি নেই। এখানে জয়জয়কার মাটনেরই। জুবানের মতো উপাদেয় বস্তুটি ছাড়া ডালগোস্ত, কিমা, কালেজি (মেটে) এবং মগজও অতি উঁচু দরের। মাঝেমধ্যে ভিন্ডি গোস্ত, পটল গোস্ত, গোবি গোস্তও পাবেন। ঘটনা হল, মাটনযোগে এ সব পদ কলকাতায় খুব বেশি জায়গায় মিলবে না।
ব্রেন বা মগজ ভাজাটা ফি-সন্ধেয় শোভাবাজারের মিত্র কাফেরও হট সেলিং আইটেম। ধর্মতলার কাছে অ্যাম্বার, নিদেনপক্ষে মেট্রোগলির আনারকলি-র ব্রেন মসালাও যুগ যুগ ধরে কলকাতা সাঁটিয়ে আসছে। কিন্তু সিরাজের মগজের ঝোলটা নিরাভরণ। কড়া মশলার বাড়াবাড়িতে আসল স্বাদটা খুন করা হয়নি।
জাকারিয়া স্ট্রিটের ডাল গোস্তও বেশ ভাল। কিন্তু মাটন ও ছোলার ডাল সিরাজে গলে-টলে পরস্পরের যেন গলা জড়িয়েছে। একটু লেবু চিপে খেতে দুর্ধর্ষ। ইউরোপের ট্যালটেলে মশলাবর্জিত ‘যাবনিক’ রান্না নিয়ে বেজায় চটেছিলেন মুজতবা আলি। কলকাতার ফাইভ স্টার ব্রেকফাস্ট বা গোটা দুনিয়ার এক ধাঁচের পরিজ-সিরিয়ালের সাত্ত্বিক ব্রেকফাস্ট থেকে রেহাই পেতে মোগলাই হোটেলের রাজসিকতারও জুড়ি নেই।
তবে শীতের মহাতারকা কিন্তু এরা নয়। তিনি হলেন পায়া। ধোঁয়া-ওঠা গরম ঝোলটা প্রথমে সুঘ্রাণেই মাত করে দেয়। তার পরে চুমুক দেওয়ার পিছে-পিছেই গলায় মশলার ঝাঁঝের আরাম। প্রকাণ্ড হাড়ের গায়ে তুলতুলে মাংসের ঢাকনিটা জিভের ঠেলাতেই মুখে চলে আসবে। এই পায়া স্রেফ শীতেই দেখা দেয়। তৃপ্তির সঙ্গে বাটি খালি করলে বেশ একটা লেপ মুড়ি দেওয়া আরাম ছুঁয়ে থাকে।
শীতের নিহারিও জাকারিয়া স্ট্রিট মাতিয়ে রাখছে এখন। সুফিয়ানা না আমিনিয়া, নিহারিতে কারা সেরা এই নিয়ে জোর টক্কর। তবে মাথায় রাখুন, সুফিয়ানার নিহারি শুধু সাত-সকালে মিলবে। আমিনিয়ার নিহারি ভরসন্ধেতেও দেখা দেয়। নিহারি বা পায়া প্রায় অর্ধেক দিন ধরে ফুটিয়ে বেশ কিছু গোপন মশলার প্রয়োগে শীতে রোজ নতুন করে জন্ম নিচ্ছে।
সাত-সকালে সিরাজে বেলা ১০টার পরে এ সব স্পেশাল ব্রেকফাস্ট আইটেম পাবেন কি না, সন্দেহ। ওই তল্লাটে গলি-ঘুঁজিতে ছাঁকা তেলে ভাজা ডালপুরি, রং-করা হলদে-সবুজ হালুয়া-পুরিরও দারুণ কদর। আর রকমারি মাংস। কাবুলি খানেরা দল বেঁধে মুজতবা আলির আমলের সরাইখানার স্টাইলেই বসে খাচ্ছেন। টেবিলের মাঝে এক-একটা গোটা তন্দুরি রুটি হাত দিয়ে ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে রাখা। ভোজের আমেজ থেকে গুষ্টিসুখটাও কিছু খাটো নয়। রুটির টুকরো ঝোলে বা চায়ে ডুবিয়ে দল বেঁধে ভোজ চলছে।
এত কিছু খেয়েও এ পাড়ায় স্পেশাল চা-টা না-খেলে আফশোস থাকবে। সর-পড়া চায়ে চুমুকের পরেই খাঁটি দুধের গন্ধে বুঁদ হতে হয়। জিরেন দেওয়া টাটকা খেজুররসের টানে শীতের শেষ রাতে ঘুম থেকে ওঠার মতো খাসা নিহারি বা পায়া চাখতেও সাত-সকালে ঘুম থেকে উঠতে হবেই। কেষ্ট বা ইষ্টলাভের জন্য এটুকু কৃচ্ছ্রসাধন মোটেও বড় ব্যাপার নয়!

আনন্দবাজার পত্রিকা

খেয়ে দেখতে পারেন